বৃহস্পতিবার ০৬ আগস্ট ২০২৬, ২২ শ্রাবণ ১৪৩৩
প্রকাশিত: ২০২৫-০৬-১৬ ০০:২২:৫৫
খোন্দকার এ.কে.এম আকরাম আলী
খোন্দকার এরফান আলী বিপ্লব: লেখক, গবেষক ও গণমাধ্যমকর্মী
বাবা শরীরে ব্যথা নিয়ে চিরদিনের জন্য চলে গেলেন, দিয়ে গেলেন হৃদয়ে ব্যথা
বুকের ভাষাকে মুখে এনে বলতে পারছি না। কলমের আঁচড়েও কিছু লিখতে পারছি না। কলম থেমে যাচ্ছে, হাত কাপছে। প্রাণপ্রিয় বাবার কথা মনে হতেই হ্নদয়টি এক অব্যক্ত বেদনায় নাড়া দিচ্ছে। মরণব্যাধি ক্যান্সার অকালে কেড়ে নিয়েছে আমার বাবা খোন্দকার এ.কে.এম আকরাম আলী'র প্রাণ।
বীর মুক্তিযোদ্ধা বাবা মনে-প্রাণে ছিলেন খুবই উদ্যমী, প্রাণবন্ত ও শক্ত মনের ধৈর্যশীল মানুষ। তাঁর শরীরে বাসা বেঁধেছিলো পোষ্ট্রেট ক্যান্সার। পরবর্তীতে পুরো শরীরে ছড়িয়েছিল মরণঘাতকটি। মরণঘাতক ক্যান্সারের কাছে আমার বাবা যেমন হার মানতে চাননি, তেমনি আমরাও চাইনি। সেজন্য করিনি চিকিৎসার কোন ত্রুটি। সাধ্যমতো চেষ্টা চালিয়েছি ঘাতকব্যাধির হাত থেকে বাবার প্রাণ রক্ষার।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাবা হার মানলেন ঘাতকব্যাধি ক্যান্সারের কাছে। দিনটি ছিলো ২০২৪ সালের ৭ ডিসেম্বর শনিবার। এইদিন রাতে বাবা দুনিয়া থেকে বিদায় নিলেন, চির বিদায়। এর আগের দিন ডিসেম্বরের ৬ তারিখে গ্ৰামের বাড়ি মাগুরা থেকে ঢাকায় আসেন ডাক্তার দেখাতে। প্রতিমাসেই অন্তত তাঁকে একবার ঢাকায় আসতে হতো ক্যান্সারের ২টি ইনজেকশন নেয়ার জন্য। বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালের চিকিৎসক প্রফেসর এস এ খানের নিকট তিনি চিকিৎসাধীন ছিলেন। ক্যান্সারের ব্যয়বহুল চিকিৎসার কাছে আমরা হার মানিনি। শরীরের রক্ত বিন্দুর মাধ্যমে হলেও বাবাকে বাঁচাতে চেয়েছিলাম, কিন্তু বাঁচাতে পারিনি।
৭ডিসেম্বর সকালে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে নিয়ে যাই বাবাকে রক্ত পরীক্ষার জন্য। দুপুরে ফিরে এসে বাবার সাথে একই বিছানায় একসাথে ঘুমাই, কথা বলি। কিন্তু এটিই যে প্রাণপ্রিয় বাবার সাথে আমার জীবনের শেষ কথা ও শেষ ঘুমানো তা কখনোই কল্পনা করতে পারিনি। ঐ দিন সন্ধ্যার পর তাঁর অবস্থা ক্রমান্বয়ে খারাপ হতে থাকে। শেষ পর্যন্ত রাত নয়টার দিকে আমাদের ছেড়ে চিরদিনের জন্য চলে যান।
ফলে পরদিন ৮ ডিসেম্বর আর ডাক্তার দেখানো হলো না, ইনজেকশন দেয়া হলো না। পরিবর্তে সাদা কফিনে জরিয়ে আবার ফিরে যেতে হলো জন্মভূমি মাগুরার শ্রীপুরে। বীরমুক্তিযোদ্ধা হিসেবে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হলো পারিবারিক কবরস্থানে। বাবাকে হারানোর সে যে কি যন্ত্রণা তা সেদিন বুঝতে পেরেছি। বুকে পাথর চেপে সহ্য করেছি। বাবা চলে গেলেন পুরো শরীরে ক্যান্সারের ক্ষত নিয়ে। আর আমাদের হ্নদয়ে দিয়ে গেলেন ব্যথা। বাবা হারানোর ব্যথা। যে ব্যথা কোনদিন ভুলবার নয়।
অথচ তিনি যখন হাসপাতালের বিছানায় মৃত্যু যন্ত্রণায় ছটফট করেছেন, রক্তে রঞ্জিত করেছেন হাসপাতালের বিছানা তখনতো আমাদের ছেড়ে যাননি। বরং কিছুটা ভালো হলে বাসায় নিয়ে আসি। অর্থনৈতিক দৈন্যতার মাঝেও চিকিৎসা চলাতে থাকি। বিন্দুমাত্র কার্পন্য করিনি। মনে আশা পোষণ করেছিলাম বাবা একটু সুস্থ হলে ওমরা হজ্ব করাতে নিয়ে যাব।সে আশাও অপূর্ণ রয়ে গেল। আরো অপূর্ণ রয়ে গেল বাবার একটা আবদার। তিনি আমার পুত্র সন্তানের মুখ দেখতে চেয়েছিলেন। সেজন্য আমার বিয়ের জন্য ছোটাছুটি করেছেন। কিন্তু তখন আমি তাঁর কথা শুনিনি, কথা রাখিনি।
আমিও বলতে চেয়েছিলাম বাবা আমি খুব শীঘ্রই আপনার আবদার রক্ষা করবো। কিন্তু সেকথা বলতে পারিনি। এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি। হ্নদয়টি প্রতিনিয়ত বেদনায় কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে।
তিনি ছিলেন আমার দেখা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ একজন বাবা। একটি বট বৃক্ষ। তিনি নিজে অনেক কষ্ট করেও কখনো আমাদের তিন ভাই ও এক বোনকে কষ্ট বুঝতে দেননি।বড় ছেলে হিসেবে আমাকে একটু অন্যরকম ভালোবাসতেন। সন্তান হিসেবে আমি তাঁর খোঁজখবর নিতে ভুলে গেলেও তিনি কখনোই ভুলেননি।
তিনি প্রতিদিনই চেষ্টা করতেন ঢাকায় অবস্থানরত তাঁর এই হতভাগা সন্তানের খোঁজ নিতে। তাঁর নানা স্মৃতি আজো আমায় কাঁদায়। কখনো আমি ফোন করলেই বলে উঠতেন বুঝেছি তোমার টাকা লাগবে।আমি না চাইতেও টাকা পাঠিয়েছেন। ভালোমন্দের খবর রেখেছেন। এখন আর কেউ খবর নেয় না,কেউ টাকা পাঠায় না। বাবা বলে আর কেউ কোনদিন ভালোবাসবে না। আদর করে কাছে ডাকবে না।
আমার বাবা মাত্র ৭৫ বছর বয়সে আমাদের ছেড়ে চলে যেতে চাননি। কিন্তু মরণঘাতক ক্যান্সার চিরদিনের জন্য তাঁকে নিয়ে গেলো। আমরা হয়ে গেলাম বাবা শূন্য, এতিম। বাবাশুন্য এই দেশ, এই পৃথিবী যেন আজ শুধুই অন্ধকার। পৃথিবীর আর কেউ যাতে অকালে বাবা হারানোর যন্ত্রণা বয়ে না বেড়ায় বাবা দিবসে সৃষ্টি কর্তার কাছে সে প্রার্থনা করছি। সেইসাথে সবার কাছে দোয়া চাইছি আমার বাবা যেন পরপারে সুখে থাকতে পারেন,মহা সুখে ...।